← সব নিবন্ধ

শিশু স্বাস্থ্য

শিশুর জ্বর: কখন চিন্তা করবেন আর কখন বাড়ির যত্নই যথেষ্ট

শিশুর জ্বর সাধারণ এবং প্রায়ই ক্ষতিকর নয়। কীভাবে তাপমাত্রা মাপবেন, নিরাপদ ঘরোয়া যত্ন, ওষুধের করণীয়-বর্জনীয় এবং যে সতর্কসংকেতে এখনই সাহায্য দরকার জানুন।

ডিজিটাল থার্মোমিটার দিয়ে ছোট শিশুর তাপমাত্রা মাপছেন একজন অভিভাবক — এমন একটি চিত্র

অবস্থা: যোগ্য চিকিৎসকের পর্যালোচনা বাকি (Pending Qualified Medical Review)। এই লেখাটি এখনও কোনো যোগ্য চিকিৎসা পেশাজীবী পর্যালোচনা করেননি।

রাত ২টা। আপনার শিশুর গা গরম, কাঁদছে, ঘুমাচ্ছে না। বাংলাদেশের প্রতিটি বাবা-মা এই মুহূর্তটি চেনেন। ওষুধ দেবেন, ঠান্ডা পানি দিয়ে মুছে দেবেন, কাঁথায় মুড়িয়ে রাখবেন, নাকি হাসপাতালে ছুটবেন?

NHS বলে, উচ্চ তাপমাত্রা ছোট শিশুদের মধ্যে খুবই সাধারণ এবং সাধারণত ১ থেকে ৪ দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায়। বেশিরভাগ জ্বর হয় সর্দি-কাশির মতো সাধারণ সংক্রমণে। কিন্তু কিছু লক্ষণ মানে শিশুর দ্রুত সাহায্য দরকার। এই গাইড আপনাকে পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করবে।

শিশুর ক্ষেত্রে কোনটিকে জ্বর বলা হয়?

NHS বলে, স্বাভাবিক তাপমাত্রা শিশুভেদে কিছুটা আলাদা হয়, এবং ৩৮°C (১০০.৪°F) বা তার বেশি হলে উচ্চ তাপমাত্রা ধরা হয়।

আপনার শিশুর:

  • পিঠ বা বুক স্বাভাবিকের চেয়ে গরম লাগতে পারে
  • ঘাম হতে পারে
  • অসুস্থ দেখাতে বা লাগতে পারে
  • কখনো খিঁচুনি (ফেব্রাইল সিজার) হতে পারে

সঠিকভাবে কীভাবে মাপবেন

ফার্মেসি থেকে একটি ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার করুন। শিশুদের জন্য NHS-এর পদ্ধতি: ১. থার্মোমিটারটি বগলের ওপরের দিকে ভেতরে রাখুন। ২. হাতটি আলতো করে বন্ধ করে শরীরের সঙ্গে চেপে রাখুন। ৩. নির্দেশিকায় যতক্ষণ বলা আছে ততক্ষণ রাখুন (অনেকগুলো তৈরি হলে বিপ শব্দ করে)। ৪. ডিসপ্লে পড়ুন।

শিশুকে সবে গোসল করানো হলে বা কম্বলে মোড়ানো থাকলে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে আবার মাপুন — অল্প সময়ের জন্য রিডিং বেশি আসতে পারে।

প্রতিটি রিডিং সময়সহ লিখে রাখুন। এই রেকর্ড চিকিৎসকের অনেক কাজে আসে।

শিশুদের জ্বর কেন হয়?

NHS ব্যাখ্যা করে, উচ্চ তাপমাত্রা হলো সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। সাধারণ কারণ:

  • সর্দি-কাশি
  • চিকেনপক্স ও টনসিলাইটিসের মতো শৈশবের রোগ
  • টিকা — ইপিআই টিকার পর হালকা জ্বর সাধারণ

বাংলাদেশে বর্ষাকালে শিশুর জ্বর ডেঙ্গুও হতে পারে, আর ডায়রিয়াসহ জ্বর পেটের সংক্রমণ হতে পারে। কারণ খুঁজে বের করতে চিকিৎসক সাহায্য করতে পারেন।

বাড়িতে জ্বরে আক্রান্ত শিশুর যত্ন

NHS বলে, সাধারণত জ্বরে আক্রান্ত শিশুর যত্ন বাড়িতেই নেওয়া যায়।

যা করবেন

  • প্রচুর তরল দিন। শিশু বুকের দুধ খেলে স্বাভাবিকভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যান।
  • পানিশূন্যতার লক্ষণে নজর রাখুন (নিচে দেখুন)।
  • খেতে চাইলে খাবার দিন — জোর করবেন না।
  • রাতেও নিয়মিত শিশুর খোঁজ নিন।
  • বিশ্রামের জন্য বাড়িতে রাখুন।
  • শিশু কষ্ট পেলে বা অস্বস্তিতে থাকলে প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন দেওয়া যায়। ওষুধ ও মাত্রা শিশুর বয়সের উপযোগী কি না প্যাকেট বা লিফলেটে দেখুন, অথবা ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করুন।
  • চিন্তিত হলে বা ওষুধে কাজ না হলে চিকিৎসা পরামর্শ নিন।

যা করবেন না

NHS স্পষ্ট সতর্ক করে:

  • ঠান্ডা করতে শিশুর কাপড় খুলে ফেলবেন না বা স্পঞ্জ করবেন না। উচ্চ তাপমাত্রা সংক্রমণের বিরুদ্ধে একটি স্বাভাবিক, সুস্থ প্রতিক্রিয়া।
  • অতিরিক্ত কাপড় বা কম্বলে ঢেকে রাখবেন না।
  • ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাসপিরিন দেবেন না।
  • চিকিৎসক বা নার্স না বললে প্যারাসিটামল ও আইবুপ্রোফেন পালা করে দেবেন না।
  • ২ মাসের কম বয়সী শিশুকে প্যারাসিটামল দেবেন না।
  • শিশুর বয়স ৩ মাসের কম, ওজন ৫ কেজির কম, চিকেনপক্স থাকলে বা পানিশূন্যতা থাকলে আইবুপ্রোফেন দেবেন না।
  • চিকিৎসক পরামর্শ না দিলে হাঁপানি আছে এমন শিশুকে আইবুপ্রোফেন দেবেন না।

বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সতর্কতা

ডেঙ্গুর মৌসুমে আইবুপ্রোফেন দেওয়ার আগে চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করুন। ডেঙ্গুতে আইবুপ্রোফেন ও এ জাতীয় ব্যথানাশক সাধারণত এড়ানো হয়, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডেঙ্গু বাদ না দেওয়া পর্যন্ত সাধারণত প্যারাসিটামলই পছন্দ করা হয়।

এছাড়া আগের বেঁচে যাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না বা প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সিরাপ কিনবেন না। শিশুদের বেশিরভাগ জ্বর ভাইরাসজনিত, এবং অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে না।

শিশুদের পানিশূন্যতার লক্ষণ

NHS উল্লেখ করে:

  • ডায়াপার খুব একটা ভেজা নয়
  • চোখ বসে যাওয়া
  • কাঁদলে চোখে পানি না আসা

আরও লক্ষণ হলো মুখ শুকিয়ে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব।

কখন দ্রুত চিকিৎসা পরামর্শ নেবেন

NHS দ্রুত পরামর্শ নিতে বলে যদি আপনার শিশুর:

  • বয়স ৩ মাসের কম এবং তাপমাত্রা ৩৮°C বা তার বেশি (অথবা আপনার মনে হয় উচ্চ তাপমাত্রা আছে)
  • বয়স ৩ থেকে ৬ মাস এবং তাপমাত্রা ৩৯°C বা তার বেশি
  • উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে অসুস্থতার অন্য লক্ষণ, যেমন র‍্যাশ, থাকে
  • ৫ দিন বা তার বেশি উচ্চ তাপমাত্রা থাকে
  • খেতে চায় না, বা স্বাভাবিক আচরণ করছে না এবং আপনি চিন্তিত
  • পানিশূন্যতা আছে

উদাহরণ

আয়ান, ২ বছর, একদিন ধরে ৩৮.৮°C জ্বর। সে পানি খাচ্ছে, প্যারাসিটামলের ডোজের মাঝে খেলছে এবং স্বাভাবিকভাবে প্রস্রাব করছে। তার মা তাপমাত্রার চার্ট রাখছেন এবং বাড়িতে নজর রাখছেন। দ্বিতীয় দিনে তিনি জ্বরের সঙ্গে পেটে র‍্যাশ লক্ষ করেন। জ্বরের সঙ্গে র‍্যাশ হলে চিকিৎসকের দেখা দরকার, তাই তিনি পরামর্শের ব্যবস্থা করেন এবং র‍্যাশের পরিষ্কার ছবি শেয়ার করেন।

জরুরি: এখনই হাসপাতালে যান বা ৯৯৯-এ কল করুন

NHS বলে, শিশুর এসব হলে জরুরি সাহায্য নিন:

  • ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
  • গ্লাস চেপে ধরলেও র‍্যাশ মিলিয়ে যায় না
  • আলোতে কষ্ট পাওয়া
  • প্রথমবার খিঁচুনি (ফেব্রাইল সিজার) এবং কাঁপুনি থামছে না
  • হাত-পা অস্বাভাবিক ঠান্ডা
  • ত্বক, ঠোঁট বা জিহ্বা নীল, ধূসর, ফ্যাকাশে বা ছোপ ছোপ (বাদামি ত্বকে হাতের তালু, পায়ের তলা, ঠোঁট ও জিহ্বা দেখুন)
  • তন্দ্রাচ্ছন্ন এবং জাগানো কঠিন
  • অত্যন্ত অস্থির (কান্না থামছে না) বা বিভ্রান্ত
  • শ্বাসকষ্ট — গোঙানি, পাঁজরের নিচে পেট ভেতরে ঢুকে যাওয়া বা খুব দ্রুত শ্বাস
  • স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিচ্ছে না, বা খাওয়া ও স্বাভাবিক কাজে আগ্রহ নেই

ডেঙ্গুর মৌসুমে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত হলে, অথবা জ্বর কমার পর শিশু খুব ঘুমকাতুরে বা অস্থির হয়ে পড়লেও হাসপাতালে যান।

জরুরি অবস্থায় অনলাইন উত্তরের অপেক্ষা করবেন না।

"গ্লাস টেস্ট"

একটি স্বচ্ছ গ্লাসের পাশ র‍্যাশের ওপর জোরে চেপে ধরুন। গ্লাসের ভেতর দিয়ে দাগগুলো এখনও দেখা গেলে, এটি মিলিয়ে না যাওয়া র‍্যাশ। এটি গুরুতর সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে — জরুরি সাহায্য নিন।

ফেব্রাইল সিজার (জ্বরজনিত খিঁচুনি) হলে?

ফেব্রাইল সিজার হলো জ্বরের কারণে খিঁচুনি। এটি খুবই ভীতিকর হতে পারে। NHS প্রথমবার ফেব্রাইল সিজারকে জরুরি সাহায্য ডাকার কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।

খিঁচুনির সময়:

  • শিশুকে নিরাপদ, নরম জায়গায় পাশ ফিরিয়ে শোয়ান
  • মুখে কিছু দেবেন না
  • কখন শুরু ও কখন থামল সময় লিখে রাখুন
  • চিকিৎসা সাহায্য নিন

আরও পড়ুন: শিশুর পাতলা পায়খানাও হলে দেখুন শিশুর ডায়রিয়া। নাক দিয়ে পানি পড়া ও কাশির জন্য পড়ুন সর্দি নাকি ফ্লু, আর পরিবারের বড়দের জন্য দেখুন প্রাপ্তবয়স্কদের জ্বর: কখন চিকিৎসক দেখাবেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

শিশুর কত তাপমাত্রায় জ্বর ধরা হয়?

NHS বলে, ৩৮°C (১০০.৪°F) বা তার বেশি হলে উচ্চ তাপমাত্রা।

শিশুদের জ্বর কতদিন থাকে?

NHS অনুযায়ী সাধারণত ১ থেকে ৪ দিন। ৫ দিন বা তার বেশি থাকলে পরামর্শ নিন।

শিশুকে কি ঠান্ডা পানি দিয়ে স্পঞ্জ করব?

না। NHS ঠান্ডা করার জন্য শিশুর কাপড় খুলতে বা স্পঞ্জ করতে নিষেধ করে।

প্যারাসিটামল ও আইবুপ্রোফেন কি একসঙ্গে দিতে পারি?

চিকিৎসক বা নার্স না বললে পালা করে দেবেন না। ডেঙ্গুর মৌসুমে চিকিৎসক পরামর্শ না দেওয়া পর্যন্ত আইবুপ্রোফেন এড়িয়ে চলুন।

টিকার পর জ্বর কি স্বাভাবিক?

টিকার পর হালকা জ্বর সাধারণ। চিন্তিত হলে বা শিশুর কোনো সতর্কসংকেত থাকলে চিকিৎসা পরামর্শ নিন।

শিশুর জ্বর কখন বিপজ্জনক?

৩ মাসের কম বয়সী শিশুর ৩৮°C বা তার বেশি তাপমাত্রা হলে দ্রুত চিকিৎসা পরামর্শ দরকার।

ShifaMate-এ শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন

শিশুর জ্বর থাকলে কিন্তু কোনো জরুরি লক্ষণ না থাকলে এবং পরামর্শ চাইলে, ShifaMate-এ শিশু বিশেষজ্ঞসহ যাচাইকৃত চিকিৎসকদের দেখে নিতে পারেন এবং অ্যাপে পরামর্শ চালিয়ে যেতে পারেন। শিশুর বয়স, ওজন, তাপমাত্রার রেকর্ড, দেওয়া ওষুধ এবং র‍্যাশ থাকলে তার ছবি শেয়ার করুন। চিকিৎসক বাড়িতে যত্ন এবং শিশুকে সরাসরি দেখাতে হবে কি না সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারবেন। ShifaMate-এর চিকিৎসকদের পূর্ণ তালিকা দেখুন।

যেকোনো জরুরি লক্ষণে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান অথবা ৯৯৯-এ কল করুন।

তথ্যসূত্র

এই লেখাটি শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য; এটি যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।

তথ্যসূত্র

এই নিবন্ধ সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য, কোনো ব্যক্তির জন্য চিকিৎসা পরামর্শ নয়। আপনার নিজের অবস্থার জন্য একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

কাপ ও চামচ দিয়ে ছোট শিশুকে খাবার স্যালাইন খাওয়াচ্ছেন একজন অভিভাবক — এমন একটি চিত্র

শিশুর ডায়রিয়া: ঘরোয়া যত্ন, ওআরএস, জিংক ও বিপদচিহ্ন

শিশুর ডায়রিয়ায় দ্রুত পানিশূন্যতা হতে পারে। কীভাবে ওআরএস ও জিংক খাওয়াবেন, কী খেতে দেবেন, কী এড়াবেন এবং কোন লক্ষণে চিকিৎসক দেখাতে হবে জানুন।