স্ক্যাবিস (খোস-পাঁচড়া) চিকিৎসা: লক্ষণ, কীভাবে ছড়ায় ও পুরো পরিবারের চিকিৎসা
রাতে চুলকানি বেড়ে যায়? স্ক্যাবিসের লক্ষণ, কেন পরিবারের সবার একসঙ্গে চিকিৎসা দরকার, চিকিৎসা কীভাবে ব্যবহার করবেন এবং কখন চিকিৎসক দেখাবেন জানুন।
চিকিৎসাগত তথ্য পর্যালোচনা করেছেন ডা. শাকিলুর রহমান, MBBS, FCPS (Part 1), MD (Phase B) · পর্যালোচনার তারিখ: ১ নভেম্বর, ২০২৬
তীব্র চুলকানি, যা রাতে আরও বাড়ে। আঙুলের ফাঁকে, কবজি ও কোমরের চারপাশে ছোট ছোট গুটি। আর কিছুদিনের মধ্যে বাড়ির অন্যরাও চুলকাতে শুরু করেন। এটাই স্ক্যাবিসের (খোস-পাঁচড়া) চেনা গল্প — বাংলাদেশে খুবই সাধারণ একটি চর্মসমস্যা, বাসাবাড়ি, মাদ্রাসা, হোস্টেল, পোশাক কারখানার ডরমিটরি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়।
স্ক্যাবিস অপরিচ্ছন্নতার লক্ষণ নয়। NHS স্পষ্ট বলে: যে কারও স্ক্যাবিস হতে পারে, এবং এর সঙ্গে অপরিচ্ছন্নতার কোনো সম্পর্ক নেই। সঠিকভাবে করলে চিকিৎসা সহজ, কিন্তু প্রায়ই ব্যর্থ হয় কারণ শুধু একজনের চিকিৎসা করা হয়, বা নিয়ম মানা হয় না। এই গাইডে কীভাবে ঠিকভাবে করবেন তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
স্ক্যাবিস কী?
WHO স্ক্যাবিসকে বর্ণনা করে ক্ষুদ্র মাইট (Sarcoptes scabiei) দ্বারা সৃষ্ট পরজীবী সংক্রমণ হিসেবে, যা ত্বকের ভেতরে গর্ত করে ডিম পাড়ে, ফলে তীব্র চুলকানি ও র্যাশ হয়।
এটা কতটা সাধারণ? WHO-র হিসাবে যেকোনো সময়ে বিশ্বে ২০ কোটিরও বেশি মানুষ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত। এটি গরম, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সবচেয়ে বেশি, এবং সম্পদ-স্বল্প পরিবেশে ৫% থেকে ৫০% শিশু আক্রান্ত হতে পারে।
স্ক্যাবিসের লক্ষণ
NHS প্রধান লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে:
- তীব্র চুলকানি, বিশেষ করে রাতে
- উঁচু র্যাশ বা গুটি
সাদা ত্বকে গুটিগুলো লাল দেখাতে পারে; বাদামি ত্বকে দেখা কঠিন হলেও হাত দিয়ে অনুভব করা যায়। র্যাশ সেরে গেলে কালো দাগ থেকে যেতে পারে।
র্যাশ কোথায় হয়
NHS বলে, র্যাশ প্রায়ই হয়:
- আঙুলের ফাঁকে
- কবজির চারপাশে
- বগলের নিচে
- কোমর, কুঁচকি ও নিতম্বের চারপাশে
সাধারণত মাথা ও ঘাড় ছাড়া পুরো শরীরে ছড়ায়। তবে বয়স্ক ও ছোট শিশুদের মাথা, ঘাড়, হাতের তালু ও পায়ের তলায় র্যাশ হতে পারে।
WHO আঙুল, কবজি, হাত, পা ও বেল্টের জায়গায় চুলকানিযুক্ত রেখা (গর্ত) ও গুটির কথাও বলে, এবং পুরুষের যৌনাঙ্গে ও নারীর স্তনে প্রদাহযুক্ত গুটির কথা উল্লেখ করে।
লক্ষণ কখন শুরু হয়
WHO বলে, প্রথমবার আক্রান্ত হলে লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ৪–৬ সপ্তাহ পর শুরু হয়। NHS জানায়, র্যাশ দেখা দিতে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত লাগতে পারে। এ কারণে একই বাড়ির মানুষের চুলকানি শুরুর আগেই মাইট থাকতে পারে।
ক্রাস্টেড স্ক্যাবিস
NHS ব্যাখ্যা করে, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার মানুষের একটি বিরল, অত্যন্ত ছোঁয়াচে ধরন হতে পারে, যাকে ক্রাস্টেড স্ক্যাবিস বলে — প্রায়ই কনুই, হাঁটু, হাত ও পায়ে খোসাযুক্ত, খসখসে র্যাশ। এতে চিকিৎসক দেখাতে হবে।
উদাহরণ
শিলা, ৩০, নারায়ণগঞ্জের একটি ছোট ফ্ল্যাটে স্বামী, দুই সন্তান ও শাশুড়ির সঙ্গে থাকেন। তাঁর ৭ বছরের ছেলের রাতে চুলকানি শুরু হয়, বেশিরভাগ আঙুলের ফাঁকে। এক সপ্তাহ পর শিলা ও তাঁর মেয়েরও চুলকানি শুরু হয়। শুধু ছেলেকে মলম দেওয়া হয়েছিল, আর পরিবারে চুলকানি বারবার ফিরে আসছিল। পাঁচজনেরই একই দিনে চিকিৎসা এবং বিছানাপত্র ধোয়ার পরই সমস্যার সমাধান হয়।
স্ক্যাবিস কীভাবে ছড়ায়
NHS বলে, স্ক্যাবিস ছড়ায় ঘনিষ্ঠ ত্বকের সংস্পর্শে, যৌন সংস্পর্শসহ। পোষা প্রাণী থেকে স্ক্যাবিস হয় না।
যাঁরা ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে থাকেন বা কাজ করেন — নার্সারি, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, নার্সিং হোম — তাঁরা বেশি ঝুঁকিতে। বাংলাদেশে এর মধ্যে আছে হোস্টেল, মাদ্রাসা, ডরমিটরি এবং এক বিছানায় ঘুমানো পরিবার।
স্ক্যাবিসে আক্রান্ত কারও সঙ্গে বিছানাপত্র, কাপড় ও তোয়ালে শেয়ার করলেও ঝুঁকি বাড়ে।
স্ক্যাবিসের চিকিৎসা
ওষুধ
WHO বলে, স্ক্যাবিসের চিকিৎসা হয় ক্রিম বা খাওয়ার ওষুধ দিয়ে। NHS পুরো শরীরে লাগানোর ক্রিম বা লোশনের কথা বলে। সাধারণভাবে ব্যবহৃত চিকিৎসার মধ্যে আছে পারমেথ্রিন ক্রিম; কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক ট্যাবলেটসহ অন্য বিকল্প দিতে পারেন।
কীভাবে লাগাবেন (NHS নির্দেশনা)
- ক্রিম বা লোশন পুরো শরীরে লাগান, মাথার ত্বক ও মুখসহ (তবে চোখের চারপাশে নয়)
- ধুয়ে ফেলার আগে কতক্ষণ রাখতে হবে তা লিফলেট দেখে নিন
- ৭ দিন পর আবার চিকিৎসা করুন
- গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ালে ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসককে জানান
সবার একসঙ্গে চিকিৎসা করুন
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। NHS বলে:
- বাড়ির সবার একই সময়ে চিকিৎসা দরকার, লক্ষণ না থাকলেও
- গত ৮ সপ্তাহে যাঁর সঙ্গে যৌন সংস্পর্শ হয়েছে, তাঁরও চিকিৎসা দরকার
২ বছরের কম বয়সী শিশু
NHS বলে, ২ বছরের কম বয়সী শিশুর ওপর ফার্মেসির চিকিৎসা ব্যবহার করবেন না — তাদের চিকিৎসক দেখাতে হবে।
চিকিৎসার সময় স্ক্যাবিস ছড়ানো ঠেকানো
NHS পরামর্শ দেয়:
যা করবেন
- চিকিৎসার প্রথম দিনে বাড়ির সব বিছানাপত্র ও কাপড় ৬০°C বা তার বেশি তাপমাত্রায় ধুয়ে ফেলুন, সম্ভব হলে গরম ড্রায়ারে শুকান
- যে কাপড় ধোয়া যায় না, তা মাইট মরে যাওয়া পর্যন্ত অন্তত ৩ দিন মুখবন্ধ ব্যাগে রাখুন
যা করবেন না
- পুরো কোর্স শেষ না হওয়া পর্যন্ত যৌন মিলন বা ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শ করবেন না
- স্ক্যাবিসে আক্রান্ত কারও সঙ্গে বিছানাপত্র, কাপড় বা তোয়ালে শেয়ার করবেন না
বাংলাদেশি বাসাবাড়ির জন্য বাস্তব টিপস
- ওয়াশিং মেশিন না থাকলে নিরাপদভাবে সম্ভব হলে খুব গরম পানিতে বিছানাপত্র ও কাপড় ধুয়ে কড়া রোদে শুকান
- বালিশ, কাঁথা/লেপ ও নরম খেলনা ধোয়া না গেলে অন্তত ৩ দিন ব্যাগে রাখুন
- পুরো পরিবারের প্রথম চিকিৎসার একই দিনে এসব করুন
স্ক্যাবিস সারতে কত সময় লাগে?
NHS বলে:
- প্রাপ্তবয়স্ক ও ৫ বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুরা চিকিৎসা শুরু করলেই কাজে বা স্কুলে ফিরতে পারে, তবে প্রথম ২৪ ঘণ্টা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়াতে হবে
- ৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা প্রথম চিকিৎসার ২৪ ঘণ্টা পর নার্সারিতে ফিরতে পারে
- চিকিৎসা দ্রুত মাইট মারে, কিন্তু চুলকানি কয়েক সপ্তাহ থাকতে পারে
চিকিৎসার পরপরই চুলকানি থাকা মানেই সবসময় চিকিৎসা ব্যর্থ নয়।
কখন চিকিৎসক দেখাবেন
NHS চিকিৎসক দেখাতে বলে যদি:
- আপনার শিশুর বয়স ২ বছরের কম এবং লক্ষণ আছে, বা বাড়ির কারও স্ক্যাবিস হয়েছে
- আপনার মনে হয় ত্বকে সংক্রমণ হয়েছে, বা একজিমার মতো অন্য চর্মরোগ আছে
- কনুই, হাঁটু, হাত বা পায়ে খোসাযুক্ত, খসখসে র্যাশ আছে
- চিকিৎসা শেষ করার ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পরও চুলকানি থাকে
জটিলতা
WHO সতর্ক করে, স্ক্যাবিস থেকে ত্বকে ঘা হয়ে সংক্রমিত হতে পারে, এবং সেপ্টিসেমিয়া (রক্তে সংক্রমণ), হৃদরোগ ও কিডনির সমস্যার মতো গুরুতর জটিলতা হতে পারে। ঘা ব্যথাযুক্ত, ফোলা, গরম বা পুঁজে ভরা হলে, অথবা জ্বর এলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
আরও পড়ুন: আংটির মতো গোল চুলকানিযুক্ত র্যাশ ছত্রাকজনিতও হতে পারে — দেখুন ছত্রাকজনিত চর্মরোগের চিকিৎসা। স্ক্যাবিসে আক্রান্ত শিশুর জ্বর এলে পড়ুন শিশুর জ্বর: কখন চিন্তা করবেন, আর পরামর্শের আগে দেখুন অনলাইনে চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
স্ক্যাবিসের প্রধান লক্ষণ কী?
তীব্র চুলকানি, বিশেষ করে রাতে, সঙ্গে উঁচু র্যাশ বা গুটি — প্রায়ই আঙুলের ফাঁকে, কবজি, কোমর ও কুঁচকিতে।
পুরো পরিবারের চিকিৎসা কেন দরকার?
র্যাশ দেখা দিতে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত লাগতে পারে, তাই অন্যদের মধ্যেও হয়তো মাইট আছে। সবার একসঙ্গে চিকিৎসা করলে একজন থেকে আরেকজনে বারবার ছড়ানো বন্ধ হয়।
স্ক্যাবিস কি অপরিচ্ছন্নতার কারণে হয়?
না। NHS বলে, যে কারও স্ক্যাবিস হতে পারে এবং এর সঙ্গে অপরিচ্ছন্নতার কোনো সম্পর্ক নেই।
স্ক্যাবিসের ক্রিম কতবার লাগাতে হয়?
NHS অনুযায়ী সাধারণত দুবার — প্রথমবারের ৭ দিন পর দ্বিতীয়বার। চিকিৎসক বা লিফলেটের নির্দেশনা মেনে চলুন।
চিকিৎসার পরও চুলকানি থাকে কেন?
মাইট মরে যাওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ চুলকানি থাকতে পারে। চিকিৎসা শেষের ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পরও চুলকালে চিকিৎসক দেখান।
বিড়াল বা কুকুর থেকে কি স্ক্যাবিস হতে পারে?
না। NHS বলে, পোষা প্রাণী থেকে স্ক্যাবিস হয় না।
ShifaMate-এর চিকিৎসকের কাছ থেকে স্ক্যাবিস নিয়ে পরামর্শ নিন
আপনার বা পরিবারের রাতে চুলকানি ও র্যাশ হলে ShifaMate-এর মাধ্যমে একজন যাচাইকৃত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। র্যাশের পরিষ্কার ছবি পাঠান (বিশেষ করে হাত, কবজি ও কোমর), বাড়িতে আর কারা চুলকাচ্ছেন তা জানান, এবং গর্ভাবস্থা বা ২ বছরের কম বয়সী শিশু থাকলে উল্লেখ করুন। চিকিৎসক পরিবারের চিকিৎসা নিয়ে পরামর্শ দেবেন এবং চিকিৎসাগতভাবে উপযুক্ত হলে ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন দেবেন। চাইলে ShifaMate-এর চিকিৎসকদের তালিকা দেখুন।
জ্বরসহ সংক্রমিত ঘা হলে দ্রুত সরাসরি চিকিৎসা নিন।
তথ্যসূত্র
এই লেখাটি শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য; এটি যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।
তথ্যসূত্র
সর্বশেষ হালনাগাদ: ২ নভেম্বর, ২০২৬
এই নিবন্ধ সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য, কোনো ব্যক্তির জন্য চিকিৎসা পরামর্শ নয়। আপনার নিজের অবস্থার জন্য একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান।