কিডনিতে পাথরের লক্ষণ: ব্যথা, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
কিডনিতে পাথরের ব্যথা তীব্র হতে পারে। কিডনিতে পাথরের লক্ষণ, কখন জরুরি সাহায্য নেবেন, পাথরের চিকিৎসা কীভাবে হয় এবং গরমে প্রতিরোধের টিপস জানুন।
চিকিৎসাগত তথ্য পর্যালোচনা করেছেন ডাঃ আতিকুর রহমান শুভ, MBBS · পর্যালোচনার তারিখ: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
যাঁদের কিডনিতে পাথর হয়েছে, তাঁরা প্রায়ই বলেন এটা জীবনের সবচেয়ে তীব্র ব্যথা — পাশে বা পিঠে তীক্ষ্ণ, মোচড়ানো ব্যথা যা ঢেউয়ের মতো আসে, কখনো ঘাম বা বমি হয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো গরম দেশে, যেখানে অনেকে পর্যাপ্ত পানি পান করেন না, কিডনিতে পাথর একটি পরিচিত সমস্যা।
সুখবর হলো, NHS অনুযায়ী বেশিরভাগ কিডনির পাথর ওষুধ দিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা করা যায়, এবং আবার হওয়ার সম্ভাবনা কমানোর স্পষ্ট উপায় আছে। এই গাইডে লক্ষণ, কখন জরুরি সাহায্য নেবেন এবং কীভাবে পাথর প্রতিরোধ করবেন তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কিডনিতে পাথর কী?
NHS ব্যাখ্যা করে, কিডনিতে পাথর সাধারণত হয় প্রস্রাবে থাকা রাসায়নিক পদার্থ জমে, যা কিডনিতে শক্ত দলা তৈরি করে।
ছোট পাথর সাধারণ এবং কোনো লক্ষণ না-ও থাকতে পারে — টের না পেয়েই প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারে। বড় পাথর তীব্র ব্যথা ঘটাতে পারে।
কিডনিতে পাথরের লক্ষণ
ব্যথা (NHS)
- সাধারণত পেটের পাশে বা কোমরের নিচের দিকে শুরু হয়
- কুঁচকি (ঊরুর ভেতরের ওপরের অংশ), অণ্ডকোষ বা যোনিপথের মুখের আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে
- আসে-যায় — কিছুক্ষণ খুব তীব্র ব্যথা, তারপর কমে বা থেমে যায়
অন্যান্য লক্ষণ (NHS)
- উচ্চ তাপমাত্রা, বা গরম, ঠান্ডা লাগা বা কাঁপুনি
- বমি ভাব বা বমি
- ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রয়োজন
- ঘোলা প্রস্রাব
কেউ কেউ প্রস্রাবে রক্তও লক্ষ করেন (গোলাপি, লাল বা বাদামি) — এটি সবসময় চিকিৎসককে দেখানো উচিত।
উদাহরণ
হাসান, ৪২, ঢাকায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেন এবং দীর্ঘ সময় গরমে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। কাছে টয়লেট না থাকায় কম পানি খান। এক রাতে ডান পাশে ছুরি বেঁধার মতো ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙে, যা কুঁচকিতে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি স্থির থাকতে পারছিলেন না, দুবার বমি করেন, আর প্রস্রাব গোলাপি দেখাচ্ছিল। পরিবার তাঁকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়, যেখানে পরীক্ষায় কিডনিতে পাথর নিশ্চিত হয়।
কখন জরুরি সাহায্য নেবেন
NHS বলে, কিডনির পাথরের কারণে লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা সাহায্য নিন, বিশেষ করে যদি:
- তীব্র ব্যথা হয়
- উচ্চ তাপমাত্রা থাকে, বা গরম, ঠান্ডা লাগা বা কাঁপুনি হয়
এসব হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান:
- ব্যথানাশকে নিয়ন্ত্রণ হয় না এমন তীব্র ব্যথা
- পাশে বা পিঠে ব্যথার সঙ্গে জ্বর বা কাঁপুনি — এটি সংক্রমিত, বন্ধ কিডনির লক্ষণ হতে পারে, যা জরুরি অবস্থা
- বমি এবং তরল ধরে রাখতে না পারা
- খুব কম বা একেবারে প্রস্রাব না হওয়া
- একটিমাত্র কার্যকর কিডনি থাকা অবস্থায় নতুন ব্যথা
কিডনির পাথর কীভাবে নির্ণয় হয়?
NHS বলে, চিকিৎসক সাধারণত লক্ষণ দেখেই কিডনির পাথর নির্ণয় করতে পারেন। তিনি আপনার রোগ, ওষুধ, খাবার ও পারিবারিক ইতিহাস জানতে চাইবেন। লাগতে পারে:
- প্রস্রাব পরীক্ষা ও রক্ত পরীক্ষা
- ব্যথা তীব্র হলে সিটি স্ক্যান (প্রাপ্তবয়স্ক)
- গর্ভবতী হলে বা ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান
কিডনির পাথরের চিকিৎসা
বাড়িতে, ওষুধ দিয়ে
NHS বলে, বেশিরভাগ পাথর ওষুধ দিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা করা যায়। তবুও ব্যথা হতে পারে এবং বেরিয়ে যেতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। সাধারণত পরামর্শ দেওয়া হয়:
- প্রচুর পানি পান করুন
- ব্যথানাশক খান
- প্রয়োজনে বমিরোধী ওষুধ খান
- পাথর বের হতে সাহায্য করে এমন ওষুধ খান
পাথর বের হলে পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করতে বলা হতে পারে (যেমন ছাঁকনির মধ্য দিয়ে প্রস্রাব করে)।
বড় পাথরের জন্য হাসপাতালের প্রক্রিয়া (NHS)
- শরীরের বাইরে থেকে শক ওয়েভ দিয়ে পাথর ভাঙা — অ্যানেস্থেশিয়া লাগে না
- মূত্রনালি দিয়ে বা পিঠে ছোট কাটার মধ্য দিয়ে সরু নল প্রবেশ করানো — সাধারণ অ্যানেস্থেশিয়ায় করা হয়
কোনটি আপনার জন্য সঠিক তা চিকিৎসক বা ইউরোলজিস্ট জানাবেন।
অপ্রমাণিত প্রতিকারে নিজে চিকিৎসা করবেন না
বাংলাদেশে অনেক ভেষজ ও "পাথর গলানো" পণ্য বিক্রি হয়। চিকিৎসকের পরীক্ষার বদলে এগুলোর ওপর নির্ভর করবেন না, বিশেষ করে জ্বর বা তীব্র ব্যথা থাকলে।
কী কারণে ঝুঁকি বাড়ে?
NHS বলে, কিডনিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি যদি আপনি:
- শরীর সজল রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান না করেন
- এমন রোগ থাকে যা শরীরে কিছু রাসায়নিক বাড়ায়, যেমন মেটাবলিক সিনড্রোম
- কিছু ওষুধ খান, যেমন অ্যাসপিরিন, অ্যান্টাসিড, ডাইইউরেটিক ও অ্যান্টিবায়োটিক
পাথর আবার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি যদি আপনি (NHS):
- বেশি প্রোটিন, কম আঁশযুক্ত খাবার খান
- নিষ্ক্রিয় বা শয্যাশায়ী থাকেন
- প্রায়ই কিডনি বা প্রস্রাবের সংক্রমণ হয়
- ঘনিষ্ঠ পরিবারের সদস্যের কিডনিতে পাথর থাকে
- আগে পাথর হয়ে থাকে
গরম ও প্রচুর ঘাম — বাংলাদেশে সাধারণ, বিশেষ করে বাইরে কাজ করা মানুষদের — পানিশূন্যতা আরও বাড়ায়।
কীভাবে কিডনির পাথর প্রতিরোধ করবেন
NHS পরামর্শ দেয়:
যা করবেন
- প্রাপ্তবয়স্ক হলে দিনে ২.৫ থেকে ৩ লিটার পানি পান করুন — শিশুরা ১ থেকে ২ লিটার
- পানিতে টাটকা লেবুর রস মেশান
- বেশি কোমল পানীয়, ক্যাফেইনযুক্ত বা অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন
- খাবারে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম আছে কি না নিশ্চিত করুন
- প্রস্রাবের রং দেখুন — গাঢ় প্রস্রাব মানে আরও পানি পান করা দরকার
যা করবেন না
- অতিরিক্ত লবণ খাবেন না — প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৬ গ্রামের কম
- চিকিৎসকের সঙ্গে কথা না বলে খাবারে বড় পরিবর্তন আনবেন না
বাংলাদেশের জন্য বাস্তব টিপস
- কর্মস্থলে, স্কুলে ও যাতায়াতে পানির বোতল সঙ্গে রাখুন
- গরমের দিনে এবং বেশি ঘামলে আরও বেশি পানি পান করুন
- পাতে কাঁচা লবণ, চানাচুর, চিপস ও আচার কমান
- দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখবেন না
- রোজা রাখলে ইফতার থেকে সেহরির মধ্যে প্রচুর পানি পান করুন
- পাথরের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসক খাদ্য পরামর্শ দিতে পারেন
আরও পড়ুন: জ্বরসহ প্রস্রাবে জ্বালা সংক্রমণ হতে পারে — দেখুন নারীদের ইউটিআই-এর লক্ষণ। ব্যথা কোমরের নাকি কিডনির, নিশ্চিত নন? পড়ুন কোমর ব্যথা উপশম। গরমে পানি পান গুরুত্বপূর্ণ: দেখুন হিট স্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
কিডনিতে পাথরের প্রথম লক্ষণ কী?
পাশে বা কোমরের নিচের দিকে আসা-যাওয়া করা ব্যথা, কখনো কুঁচকিতে ছড়িয়ে পড়ে, প্রায়ই বমি ভাব বা ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রয়োজনসহ।
কিডনির পাথর বের হতে কত সময় লাগে?
NHS বলে, প্রস্রাবের সঙ্গে পাথর বের হতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে।
কিডনির পাথর প্রতিরোধে কতটা পানি পান করা উচিত?
NHS প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ২.৫ থেকে ৩ লিটার পানি পান করতে বলে।
লেবু-পানি কি কিডনির পাথরে সাহায্য করে?
প্রতিরোধের অংশ হিসেবে NHS পানিতে টাটকা লেবুর রস মেশানোর পরামর্শ দেয়।
কিডনিতে পাথর থাকলে কি ক্যালসিয়াম খাওয়া বন্ধ করব?
না। NHS খাবারে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম রাখতে বলে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বাদ দেবেন না।
কিডনির পাথরের ব্যথা কি জরুরি অবস্থা?
তীব্র ব্যথা, বা জ্বর কিংবা কাঁপুনিসহ ব্যথায় দ্রুত চিকিৎসা সাহায্য দরকার।
ShifaMate-এর চিকিৎসকের কাছ থেকে কিডনির পাথর নিয়ে পরামর্শ নিন
আগে কিডনিতে পাথর হয়ে থাকলে, হালকা লক্ষণ থাকলে, বা আলট্রাসাউন্ড কিংবা প্রস্রাবের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে ShifaMate-এর মাধ্যমে একজন যাচাইকৃত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। লক্ষণ জানান এবং রিপোর্টের ছবি শেয়ার করুন। চিকিৎসক পরবর্তী পদক্ষেপ ও প্রতিরোধ নিয়ে পরামর্শ দেবেন এবং চিকিৎসাগতভাবে উপযুক্ত হলে ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন দেবেন। চাইলে ShifaMate-এর চিকিৎসকদের তালিকা দেখুন।
তীব্র ব্যথা, পাশে ব্যথাসহ জ্বর বা প্রস্রাব করতে না পারলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান।
তথ্যসূত্র
এই লেখাটি শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য; এটি যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।
তথ্যসূত্র
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
এই নিবন্ধ সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য, কোনো ব্যক্তির জন্য চিকিৎসা পরামর্শ নয়। আপনার নিজের অবস্থার জন্য একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান।